১২ হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ‘ডায়ার উলফ’ নামে এক প্রজাতির বিশালদেহী নেকড়েকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এমনটাই দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জৈবপ্রযুক্তি কোম্পানি কলোসাল বায়োসায়েন্সেস। তাদের দাবি, আধুনিক জিন প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিএনএ থেকে এদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানী মহলে প্রশ্ন উঠেছে এর সত্যতা নিয়ে।
জীববিজ্ঞানের মতে, প্রাচীন পৃথিবীতে অনেক বড় বড় তথা বিশালদেহী প্রাণীর অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এসব প্রাণীর অনেকেরই বিলুপ্তি ঘটেছে। যেমন ডাইনোসর ও ম্যামথ (বিশালদেহী এক প্রজাতির হাতি)। তেমনই একটি বিশেষ প্রজাতির প্রাণী ডায়ার উলফ। যার বিজ্ঞানসম্মত নাম অ্যায়োনোসিয়ন ডায়রাস।
ডায়ার উলফ উত্তর আমেরিকার এক সময়কার শীর্ষ শিকারী প্রাণী। এরা ছিল আকারে সাধারণ ধূসর নেকড়ের চেয়ে বড়, মাথা অপেক্ষাকৃত চওড়া, পাতলা ও ঘন লোমের অধিকারী। এই ডায়ার উলফ এখন প্রায় ১২ হাজার বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল বলে অনুমান করা হয়।
হাজার হাজার বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণীটিকে এক দশক আগে জনপ্রিয় টেলি সিরিজ ‘গেম অফ থ্রোনস’-এর অন্যতম চরিত্র হিসেবে উপজীব্য করে তোলা হয়। এবার জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং তথা জিন প্রযুক্তিবিদ্যায় ভর করে পৃথিবীতে ফিরে এলো সেই ডায়ার উলফ।
কলোসাল বায়োসায়েন্সেস নামক মার্কিন বায়োটেক সংস্থার কর্মকর্তাদের দাবি, জিন প্রযুক্তিবিদ্যার সাহায্যে তারা বিশ্বের প্রথম ‘ডি-এক্সটিঙ্কশন’ (বিলুপ্ত প্রাণী পুনরুদ্ধার)-এর কাজ সফল ভাবে সম্পন্ন করেছেন।
সফলভাবে পরীক্ষাগারে তিনটি ডায়ার উলফের শাবকের জন্ম হয়েছে। ঠিক যেমনটা করেছিলেন হলিউডের ছবি ‘জুরাসিক পার্কে’ জিনপ্রযুক্তি সংস্থা ইনজেনের প্রতিষ্ঠাতা জন হ্যামন্ড যার নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন অভিনেতা রিচার্ড অ্যাটনবরো।
কলোসাল বায়োসায়েন্সেস জানিয়েছে, তাদের বিজ্ঞানীরা প্রথমে ডায়ার উলফের জিনোম (বংশোগতির ধারায় সঞ্চালিত জিন মানচিত্র) পুনরুদ্ধার করে। যা প্রাচীন ডিএনএ থেকে সংগ্রহ করা হয়। এরপরে সেই জিনোমের মৌলিক বৈশিষ্টগুলো চিহ্নিত করা হয়।
এর পরের ধাপে আধুনিক গ্রে উলফ বা ধূসর নেকড়ের ডিএনএ সংগ্রহ করে জিন প্রযুক্তিবিদ্যার সাহায্যে তৈরি করেন ডায়ার উলফের ‘জেনেটিক কোড’ সম্বলিত ডিএনএ। সেই ডিএনএ প্রতিস্থাপিত করা হয় ধূসর নেকড়ের ডিম্বাণুতে।
কারণ জিন বিশেষজ্ঞ রলেন্সের মতে, ২৫ লক্ষ বছর আগে বংশগতির ধারায় জিনগত পৃথকীকরণ হয়েছিল দুই প্রজাতির নেকড়ের। ফলে এখনও অনেক জিনগত মিল রয়েছে তাদের।
তবে নেকড়ে নয়, ডায়ার উলফ ভ্রূণের ‘গর্ভধারিণী’ (সারোগেট মাদার) হিসাবে বেছে নেয়া হয় কুকুরকে। কলোসাল বায়োসায়েন্সেস-এর প্রধান নির্বাহী (সিইও) বেন ল্যাম টাইম ম্যাগাজিনকে জানিয়েছেন, তাদের বিজ্ঞানীরা একটি ১৩ হাজার বছর পুরনো দাঁত এবং ৭২ হাজার বছর পুরনো খুলি থেকে ডায়ার উলফের ডিএনএ সংগ্রহ করেন।
আধুনিক ধূসর নেকড়ের জিনোমে প্রাচীন ডায়ার উলফের ডিএনএ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে নতুন শাবকের জন্ম দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘জিন প্রযুক্তিবিদ্যার ক্ষেত্রে এটি ঐতিহাসিক সাফল্য।’
সদ্যোজাত তিন ডায়ার উলফ শাবকের নাম দেয়া হয়েছে, রোমুলাস, রেমুস ও খালেসি। কোম্পানিটি শাবকগুলোর ছবিও প্রকাশ করেছে। রোমুলাস ও রেমুস আদতে রোমান উপকথার চরিত্র। গেম অব থ্রোনসের একটি নারী চরিত্রের নাম।
এই তিন ডায়ার উলফ ছানা এখন দুই হাজার একরের একটি সুরক্ষিত এলাকায় বাস করছে, যার অবস্থান গোপন রাখা হয়েছে। এলাকাটিকে 'চিড়িয়াখানা মানের' ১০ ফুট উঁচু বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। তাদের সুরক্ষার জন্য নিরাপত্তারক্ষী, ড্রোন ও সরাসরি ক্যামেরা নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
যদিও জিন বিজ্ঞানীদের একাংশ এখনও কলোসাল বায়োসায়েন্সেস-এর দাবির সত্যতা সম্পর্কে সন্দিহান। তাদের দাবি, হাজার হাজার বছর আগে বিলুপ্ত প্রাণীর জিন পুরোপুরি পুনর্গঠন করা প্রায় অসম্ভব, কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডিএনএ নষ্ট হয়ে যায়।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিংহভাগ বিশ্লেষকই বলছেন, এগুলো কেবল 'জিন বদলানো ধূসর নেকড়ে'। নিউজিল্যান্ডের ওতাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যালিওজেনেটিসিস্ট ড. নিক রলেন্সের মতে, 'কলসাল আসলে কয়েকটা ধূসর নেকড়ে তৈরি করেছে, তবে তাদের মধ্যে ডায়ার নেকড়ের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন, তাদের খুলি বড় এবং পশম সাদা। এরা আসলে হাইব্রিড।'

No comments:
Post a Comment